
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আবারও ফিরে এসেছে ১৫ অগাস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম শোকাবহ দিন। ৫১ বছর আগে ১৯৭৫ সালের এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়।
আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে ১৫ অগাস্ট জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালিত হতো। পুরো আগস্ট মাসজুড়েই থাকত নানা কর্মসূচি। তবে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এবার তৃতীয়বারের মতো বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় বা দলীয় কর্মসূচি ছাড়াই দিনটি এসেছে।
২০২৪ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১৫ অগাস্টের ‘জাতীয় শোক দিবস’-এর সরকারি ছুটি বাতিল করে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে।
বঙ্গবন্ধুর বড় মেয়ে ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বৈরশাসন এবং আন্দোলনকারীদের হত্যার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে ভারতে অবস্থান করছেন। দেশের বিভিন্ন আদালতে তার বিরুদ্ধে ছয় শতাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান ঠেকাতে দমন-পীড়নে অংশ নেওয়ার অভিযোগে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এখনও নিষিদ্ধ। শেখ হাসিনার মতো দলটির অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা আত্মগোপনে রয়েছেন। অনেকে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। দলটির তৃণমূলের কর্মীরাও অনেকটা ছন্নছাড়া।
একজন শেখ মুজিব
১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট ভোরে সেনাবাহিনীর একদল কর্মকর্তা ও সৈনিকের হাতে সপরিবারে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান। সেদিনের হত্যাকাণ্ডে পরিবারের ছয় বছরের শিশু থেকে শুরু করে অন্তঃসত্ত্বা নারীও ঘাতকদের হাত থেকে রেহাই পাননি।
১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন এবং ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনে নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন শেখ মুজিব।
১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার তাকে তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামি করলে তিনি বাঙালির অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে কারামুক্ত হওয়ার পর ছাত্র-জনতা তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে।
১৯৭১ সালের মার্চে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণে শেখ মুজিব বাঙালিকে স্বাধীনতার সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান। তার নেতৃত্বে শুরু হওয়া মুক্তির সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের দায়িত্ব নেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্টের হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়।
সেই রাতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে নিহত হন তার স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব, তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, শেখ জামালের স্ত্রী রোজী জামাল এবং বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ নাসের।
একই রাতে নিহত হন বঙ্গবন্ধুর বোনের স্বামী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছেলে আরিফ, মেয়ে বেবী ও শিশুপৌত্র সুকান্ত বাবু। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি এবং নিকট আত্মীয় শহীদ সেরনিয়াবাত ও রিন্টুও হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
৫১ বছর পরও ১৫ অগাস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীরভাবে আলোচিত ও বিতর্কিত একটি অধ্যায় হয়ে আছে। সময়ের পরিবর্তনে দিনটির রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও রাজনৈতিক আয়োজনের ধরন বদলালেও ১৯৭৫ সালের সেই রক্তাক্ত রাত বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবেই রয়ে গেছে।
