নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

জুলাইয়ের শুরু থেকেই চোখ রাঙাচ্ছে মুন্সিগঞ্জের ডেঙ্গু পরিস্থিতি – ক্রমেই মোড় নিচ্ছে ভয়াবহ দিকে,এতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে সিজনাল ভাইরাস জ্বর। অন্যদিকে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে গেলে মিলছে না কাঙ্খিত সেবা,রয়েছে ডেঙ্গু আক্রান্তদের প্রয়োজনীয় স্যালাইন সহ পর্যাপ্ত ঔষধ ও মশারি না দেয়ার অভিযোগ।

তবুও বরাবরের মতোই দায়সারা মন্তব্য জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতার কোন বিকল্প নেই মত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের।

গতকাল শুক্রবার (২৪ জুলাই) সকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, রোগীর চাপে যেন তিল ধারণের ঠাঁই নেই, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের নতুন ভবনের চতুর্থ ও পঞ্চম তলার বারান্দাতে সহ মহিলা- শিশু ও পুরুষ ওয়ার্ডে,খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডেঙ্গু সহ সিজনাল ভাইরাস জ্বরের আক্রান্ত হয়ে জেলা সদরের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসেছেন অধিকাংশ ডেঙ্গু রোগী।

পাশাপাশি পেটের ব্যাথা ও ডায়রিয়া সহ জ্বর নিয়েও এসেছেন অনেকে। তবে মাত্রা অতিরিক্ত রোগীদের বাড়তি চাপ, বিড়ম্বনা বাড়িয়েছে সেবা প্রত্যাশীদের। আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৯৫% শতাংশ মানুষের বাড়ি, মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার নতুনগাঁও, মিরেশ্বর,মহাকালী ও পঞ্চসার ইউনিয়ন সহ শহরের উত্তর ও দক্ষিণ ইসলামপুর এবং খালিস্ট এলাকায়,এছাড়া মিরকাদিম পৌরসভা এলাকা থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন অনেকে।

জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ,মানহীন চিকিৎসা সেবায়, দীর্ঘদিন লাগছে আক্রান্ত দের সেড়ে উঠতে, রয়েছে পর্যাপ্ত ঔষধ ও প্রয়োজনীয় স্যালাইন সহ ডেঙ্গু আক্রান্তদের মশারি না দেয়ার অভিযোগ।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর প্রায় ৬ শতাধিক ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন মুন্সিগঞ্জ সদর হাসপাতালে। এছাড়া আরও পাঁচটি অন্যান্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি ছিলেন প্রায় ৪ শতাধিকের বেশি রোগী। তবে ডেঙ্গুর পাশাপাশি সিজনাল ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত রোগীরাই সব থেকে বেশি চিকিৎসা নিয়েছেন হাসপাতালে ভর্তি থেকে, যার সংখ্যা ছাড়িয়েছে প্রায় আড়াই হাজারের বেশি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য বলছে,এবার জুলাই মাসের শুরু থেকেই মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন করে ভর্তি হচ্ছে ডেঙ্গু রোগী।

তীব্র জ্বর, শরীর ব্যথা, বমি ডায়রিয়া সহ নানান উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসছেন রোগীরা। বর্তমানে গত বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন নারী,পুরুষ ও শিশু সহ প্রায় ৩৪ জন। আক্রান্তদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী ও শিশু।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী,জুলাই মাসের ০১-তারিখ থেকে হাসপাতালের ৫টি ডেঙ্গু আইসোলেশন কক্ষে ২৪ তারিখ পর্যন্ত ভর্তি হয়েছেন ৩৩৪ জন ডেঙ্গু রোগী। এছাড়া পরিসংখ্যান বলছে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালটিতে ভর্তি থেকেছেন, জানুয়ারি মাসে ১১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৫জন, মার্চ মাসে ৪জন, তবে এপ্রিল মাস থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে আক্রান্তের সংখ্যা সেই মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছিলো ৩৯ জন, এরপর পর্যায়ক্রমে মে মাসে ভর্তি হয় ৩৫ জন, তবে জুন মাস থেকেই বদলে যায় পরিস্থিতি ১৫১ জন রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয় হাসপাতালে। এরপর জুলাই মাস থেকেই ক্রমেই ভয়াবহ দিকে যাচ্ছে পরিস্থিতি।

চিকিৎসকরা বলছেন,আক্রান্তদের শরীরে দ্রুত কমছে রক্তের প্লাটিলেট,এতে দীর্ঘায়িত হচ্ছে রোগীদের সেরে ওঠার ক্ষেত্রে। ভর্তির পর থেকেই হাসপাতালে প্রয়োজনীয় স্যালাইন সহ ঔষধ দেয়া হচ্ছে রোগীদের, একই অবস্থা আক্রান্ত অন্যান্যদের।

হাসপাতালটির নতুন ভবনের পঞ্চম তলার শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা ৫বছর বয়সী ডেঙ্গু রোগী তাসনিম আক্তারের মা, সুমি বেগম বলেন, জেলা শহরের খালিষ্ট এলাকায় একটি ভাড়া বাড়িতে বসবাস করেন তিনি, সেখানেই মশার কামড়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পরে, তীব্র জ্বর নিয়ে গত বুধবার তার শিশু কন্যাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন।

তিনি অভিযোগ করেন, মুন্সিগঞ্জ পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ও এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে যথাযথ কার্যকর ভূমিকা না থাকায় সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতায় বৃদ্ধি পাচ্ছে আক্রান্তের সংখ্যা। ফলে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।

একই পরিস্থিতি ৪র্থ তলায় পুরুষ ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা, শহরের উত্তর ইসলামপুর এলাকার বাসিন্দা সামিম মোল্লার, তিনি বলেন, শরীলে তীব্র ব্যথা ও জ্বর নিয়ে ভর্তি হয়েছেন হাসপাতালে। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে পৌর কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় ঘরে ঘরে জ্বরে ও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। এবং সংশ্লিষ্টদের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান।

ভর্তি থাকা অন্যান্য রোগীদের সাথে কথা হলে তারা জানান, একই রকম ভুক্তভোগী তারাও হাসপাতালের সেবার মান উন্নয়ন ও বিভিন্ন এলাকায় সংশ্লিষ্টরা এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। তবে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ রয়েছে মিরকাদিম পৌরসভা এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়া রোগী ও তার স্বজনদের। সেখানকার সংশ্লিষ্টরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ফলে পৌরবাসীর সমস্যা তাদের চোখে অদৃশ্য হয়ে আছে দাবি করে ভুক্তভোগী ডেঙ্গু রোগী সলমা বেগম বলেন, এডিস মশার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না মিরকাদিম পৌর কর্তৃপক্ষ।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার নিয়ন্ত্রণে জোরালো কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ায়,মুন্সিগঞ্জে ক্রমেই ভয়াবহ হচ্ছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি এতে প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। এমন পরিস্থিতিতেও সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবারে দেখা মেলে না চিকিৎসকদের।

এমন পরিস্থিতিতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতার কোন বিকল্প নেই বলে, পরামর্শ চিকিৎসকদের। মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসাল্টেন্ট( মেডিসিন) ডা.মোঃ সাইদুর রহমান হিমেল বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা না গেলে আরো উদ্বেগ জনক দিকে যেতে পারে মুন্সিগঞ্জের ডেঙ্গু পরিস্থিতি, এই ক্ষেত্রে বাসা বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার রাখ সহ পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টিকর তরল খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে সেবা বঞ্চিত রোগীদের, নানান অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও, দায়সারা মন্তব্য জানিয়েছেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা.মোঃ আরিফুজ্জামান। তিনি বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্তদের সেবার মান উন্নয়নে আলাদা আইসোলেশন কক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছে, রোগীদের পর্যাপ্ত স্যালাইন সহ মশারি এবং প্রয়োজনীয় ঔষধ দেয়া হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি উদ্বেগ জনক হওয়ায়, সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে কিছুটা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। তবুও তিনি দাবি করেছেন,পরিস্থিতি অনুযায়ী সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।

অন্যদিকে মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিট আনুষ্ঠানিকভাবে চালুর ঘোষণা দেওয়া হলেও লোকবল নিয়োগ না হওয়ায় কার্যত অচল আইসিইউ ইউনিট। এতে ডেঙ্গু আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগী নিয়ে প্রায়শই বিড়ম্বনায় পড়ছেন স্বজনরা। তবে কবে নাগাদ আইসিইউ কার্যক্রম চালু হতে পারে সেই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য দিতে পারেননি তত্ত্বাবধায়ক।

তবে শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে লিফলেট বিতরণ করা সহ সকালে ও বিকালে মশক নিধন স্প্রে করার পাশাপাশি ফরগার মেশিন দিয়ে বৃষ্টিতে পানি জমাট বেঁধে আছে এমন স্থানে ধোয়া দেয়া হচ্ছে বলে দাবি করেছেন, মুন্সিগঞ্জ পৌরসভার মৌসুমী মাহবুব। প্রায় একই দাবী মিরকাদিম পৌর প্রশাসক ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফার। তিনি বলেন, এডিস মশার নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকায় যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে পৌর কর্তৃপক্ষ।