নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

আমার মা গর্ভবতী, মা বলেছে আমার আরো একটা বোন হবে, আমার বাবা তো বিদেশে গিয়ে আমাদের এতিম করে দিলো, আমরা তিন বোন এখন আর বাবা ডাকবো কাকে! দুই মাস আগে বাবা যাওয়ার সময় বলেছিল বিদেশে গিয়ে আমাদের ভাগ্য বদলাবে, কিন্তু আমরা তো এখন এতিম। এভাবেই কান্না জড়িত কন্ঠে তিন বোন একসাথে বসে নিহত প্রবাসী বাবার ছবি হাতে নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত প্রবাসী বাংলাদেশী মুন্সিগঞ্জের রাজিক বেপারীর বড় মেয়ে রামিসা।

নিহাতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়,মাত্র আড়াই মাস আগে জীবিকার তাগিদে কন্যা সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে সুন্দর ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি।

মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে নিহত প্রবাসী রাজিক বেপারীর নিশ্চিত মৃত্যুর খবরে মুন্সিগঞ্জের দক্ষিণ কালিন্দিপাড়া এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। মুহূর্তেই স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে সেখানকার পরিবেশ।

পরিবারের স্বজনরা জানান,দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের কুইন্সটাউন (বর্তমান কোমানি) থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরের সমো এলাকায় একটি সুপার শপ ও ইলেকট্রনিক্স দোকানে সোমবার দিবাগত ভোর রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

নিহতের স্বজনরা আরও জানায়,আগুন লাগার সময় দোকানের ভেতরে থাকা আবাসিক কক্ষে সাতজন ঘুমিয়ে ছিলেন এরমধ্যে রিজিক বেপারী সহ ছয়জন বাংলাদেশি আগুনে পুড়ে মারা যান। তবে এ ঘটনায় আহত অবস্থায় প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন একজন।

নিহত রাজিক বেপারী (৫২) মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার মিরকাদিম পৌরসভার দক্ষিণ কালিন্দিপাড়া এলাকার মৃত সালাম বেপারীর ছেলে।

এদিকে মর্মান্তিক এমন ঘটনায় শোক জানিয়েছেন, নিহতের স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয়রা,পাশাপাশি দ্রুত মরদেহটি সরকারি সহযোগিতায় দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতার দাবি জানিয়েছেন অনেকে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিহতের বোন ফাতেমা বলেন, “আমার ভাইয়ের তিনটি মেয়ে রয়েছে। তার স্ত্রী বর্তমানে অন্তঃসত্ত্বা। সংসারের হাল ধরতে এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে বিদেশে গিয়েছিল। মঙ্গলবার সকালে আগুন লাগার খবর পাই। পরে জানতে পারি, আমার ভাই আর বেঁচে নেই। এখন আমার ভাতিজিদের কী হবে?”

নিহতের ভাই সালাম বেপারী বলেন, “শুনেছি আমার ভাইয়ের মরদেহ আগুনে পুড়ে কঙ্কাল হয়ে গেছে। সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি, যেন অন্তত তার মরদেহ দেশে এনে আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। অসহায় পরিবারটির পাশে যাতে সরকার দাঁড়িয়ে কবিতা করে আমি সেই দাবি জানাচ্ছি।

অন্যদিকে কান্নায় ভেঙে পড়া নিহত প্রবাসীর তিন কন্যার মধ্যে মেঝো মেয়ে রাইছা বলেন,আমাদের পরিবারের ভাগ্য বদলাতে গিয়ে, আমার বাবা আমাদের চিরদিনের জন্য ছেড়ে চলে গেছে, এটা মেনে নেয়াটা আমাদের জন্য দুঃস্বপ্নের মত, আমরা চাই যেভাবেই হোক আমার বাবার মরদেহ টা সরকারি সহযোগিতায় যাতে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়। আমরা তো এতিম হয়ে গেলাম এখন আমারা তিন বোন আর কাকে বাবা ডাকবো?

পরিবারের সদস্যরা জানান,মাত্র আড়াই মাস আগে জীবিকার সন্ধানে নিকট আত্মীয়দের সহযোগিতায় দক্ষিণ আফ্রিকায় যান মুন্সিগঞ্জের রাজিক বেপারী। সেখানে একটি দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করছিলেন তিনি। পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি এবং তিন কন্যা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার স্বপ্ন নিয়েই তিনি প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্নের নির্মম পরিণতি হলো অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।

এদিকে খবর পেয়ে নিহতের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের স্বজনদের সমবেদনা জানিয়েছেন, সদর উপজেলা ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মারজানা আক্তার।

তিনি জানান,সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে নিহত প্রবাসীর পরিবারটিকে।