নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যায়,মুন্সিগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জ নৌরুটে জরাজীর্ণ আর ফিটনেসবিহীন লঞ্চ দিয়ে ঝুঁকি নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে চলছে যাত্রী পারাপার।

বিগত কয়েক বছর যাবত এ নৌরুটের লঞ্চ সার্ভিসের বেহাল অবস্থা যেন কাটছে-ই না। একদিকে ফিটনেস বিহীন পুরাতন জরাজীর্ণ লঞ্চ আর অন্যদিকে শীতলক্ষ্যা নদীতে যত্রতত্র নোঙর করা কার্গো জাহাজ।

ফলে বর্ষা মৌসুমে প্রতিদিন বিপদের ঝুঁকি নিয়েই এ রুটে যাতায়াত করতে হচ্ছে শত শত যাত্রীদের। তার ওপর মাঝেমধ্যে অতিরিক্ত যাত্রী নেয়া সহ অদক্ষ চালক তো রয়েছেই। তবে স্থানীয় জেলা প্রশাসনের দাবি খুব শীঘ্রই এসব ফিটনেসবিহীন লঞ্চ ও মালিকদের বিরুদ্ধে নেয়া হবে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা।

সম্প্রতি এবার,বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বৃদ্ধি ও বৈরী আবহাওয়ায় জরাজীর্ণ এসব লঞ্চ চলাচলে ও অদক্ষ চালকদের কারণে অতীতের মতই বড় দূর্ঘটনার আশঙ্কা এখন বেড়েছে আরও কয়েকগুণ। রোদ কিংবা বৃষ্টিতে সামান্য আবহাওয়ার পরিবর্তন হলেই পাল্টে যায় এই নৌরুটে, নদীপথের দৃশ্যপট। উওাল ঢেউয়ে কাছে অনেকটাই অসহায় হয়ে পরে যাত্রীরা।

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সরোজমিনে মুন্সিগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনাল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে,দীর্ঘদিনের পুরনো ফিটনেসবিহীন এসব লঞ্চ প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ২০ মিনিট পর পর নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় এই টার্মিনাল থেকে। প্রতিদিন হাজারো যাত্রী চলাচল করছে এসব লঞ্চে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,এর মধ্যে অধিকাংশ যাত্রী মুন্সিগঞ্জ থেকে নারায়ণগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকা যাতায়াত করে। আর একইভাবে নারায়ণগঞ্জ টার্মিনাল থেকে প্রতিটি লঞ্চ যাত্রী বোঝাই করে ফিরে আসে মুন্সিগঞ্জের উদ্দেশ্যে।

যাত্রীদের অভিযোগ,এই রুটে চলাচল করা সব কয়টি ফিটনেসবিহীন লঞ্চ নানা ভাবে জোড়াতালি আর মেরামত করেই চলছে বছরের পর বছর।

নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্রে জানা গেছে, এই নৌরুটে বর্তমানে ২৪টি লঞ্চ চলাচল করছে। যার মধ্যে অধিকাংশ লঞ্চের ই মেয়াদ ফুরিয়েছে চলাচলের, নেই কোনো বৈধ কাগজপত্র।  কিংবা চলাচলের অনুমতি তবুও দিনের-পর-দিন মেরামত আর জোড়াতালি দিয়েই চালানো হচ্ছে এসব লঞ্চ গুলোকে।  যার মধ্যে অধিকাংশ লঞ্চের নেই ফিটনেস অর্থাৎ চলাচলের উপযুক্ত থাকার ছাড়পত্র।

অন্যদিকে ধলেশ্বরী থেকে শীতলক্ষ্যা নদীর প্রবেশ মুখ সহ অধিকাংশ স্থানে সরেজমিনে দেখা গেছে,বিভিন্ন সিমেন্ট ফ্যাক্টরি নোঙ্গর করে রেখেছে সারি সারি কার্গো জাহাজ। আর এসব জাহাজের কারণে প্রতি মুহূর্তেই এই নৌ রুটে চলাচলকারী লঞ্চ গুলোকে পোহাতে হচ্ছে নানা বিরম্বনা।

অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে, অবৈধ ভাবে মাঝ নদীতে নোঙ্গর করা এসব কার্গো জাহাজের কারণে লঞ্চ চলাচলে ঝুঁকি বেড়েছে বিগত বেশ কয়েক বছরের তুলনায় কয়েকগুন বেশি বলছেন।

নৌ-রুটে নিয়মিত যাতায়াত করেন এমন যাত্রীরা বলছেন, যে কোনো সময় আবারও ঘটতে পারে বড় কোন দুর্ঘটনা।

লঞ্চ যাত্রী কামাল হোসেন বলেন, আমাকে প্রতিদিনই ব্যবসার কাজে মুন্সিগঞ্জ থেকে নারায়ণগঞ্জের বন্দরে যেতে হয়। সড়ক দীর্ঘ পথ ঘুরে যাওয়া সহ যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব একটা ভালো না হওয়ার কারণে, ভোগান্তি এড়াতে লঞ্চে করেই কর্মস্থল থেকে আসা যাওয়া করি।  কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ এসব ফিটনেসবিহীন লঞ্চের কারণে প্রতিনিয়ত আমাদের জীবনটা ঝুঁকির মধ্যে থাকে,  কিন্তু জীবিকার তাগিদে আমাদের বাধ্য হয়েই এ পথে চলাচল করতে হয়। আর আমরা দেখিয়েছি অধিকাংশ লঞ্চের চালকই অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক তাই এসব কারণেই আমাদের এই নৌরুটে যাতায়াতে ঝুঁকি বেড়েছে কয়েকগুণ।

এসব লঞ্চে নিয়মিত যাতায়াতকারী আরেক যাত্রী ও  বেসরকারি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা আনোয়ার মিয়া বলেন, আমি প্রতিদিনই এই লঞ্চগুলো দিয়ে আসা-যাওয়া করি, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত গন্তব্যস্থলে না পৌঁছায় বা ফিরে না আসি ততক্ষণ মানসিক দুশ্চিন্তা নিয়ে থাকি কারন এই নৌপথে যাতায়াতকারী প্রতিটি লঞ্চে থাকে অতিরিক্ত যাত্রী, কোন কোনটিতে যাত্রীর চাপ কম থাকলে, কম সংখ্যক যাত্রী নেয়া হলেও অধিকাংশ লঞ্চেই প্রতিদিন নেয়া হচ্ছে অতিরিক্ত যাত্রী।

আরো বেশ কয়েকজন যাত্রীর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলে তারা জানান, প্রতিদিনই ব্যবসাসহ নানা কাজে মুন্সিগঞ্জ থেকে নারায়ণগঞ্জ কিংবা ঢাকায় যেতে হয় কিন্তু সড়ক পথে দীর্ঘ সময় লাগার কারণে লঞ্চেই বেশিরভাগ সময় যাতায়াত করে থাকে মানুষ। এ রুটে লঞ্চ চলাচলের অবস্থা খুবই খারাপ, অধিকাংশ লঞ্চই ভাঙাচোরা আর বেশিরভাগ লঞ্চের ই ফিটনেস নেই বলে আমরা জানি  তবুও সময় বাঁচাতে আমাদের বাধ্য হয়েই ঝুঁকি নিয়ে এসব লঞ্চের চলাচল করতে হয়।

লঞ্চ যাত্রী কলেজছাত্র জীবন আহমেদ বলেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকলে এইসব লঞ্চে করেই শত শত শিক্ষার্থী নিয়মিত নারায়ণগঞ্জ আর ঢাকায় যাতায়াত করেন।

তিনি জানান, এসব লঞ্চে যাতায়াতে প্রতিমুহূর্তেই ঝুঁকি থাকে বিশেষ করে এখন কার সময় বর্ষা মৌসুমে ছোট ছোট জরাজীর্ণ এইসব লঞ্চে আবারও যেকোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটার আশংকা থেকেই যায়। ফলে নৌপথটির যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত কারার দাবী জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে, একাধিক লঞ্চ চালক ও মালিকরা বলছেন অবৈধভাবে নদীতে নোঙ্গর করে রাখা ও বেপরোয়া গতিতে চলাচল করা এসব কার্গো জাহাজের জন্য সব থেকে বেশি বিপাকে পড়তে হচ্ছে চালক সহ যাত্রীদের, এতে যে কোন মুহুর্তে আবারো বড় কোনো দুর্ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ফলে শীঘ্রই এ ব্যাপারে প্রশাসনের কঠোর নজরদারির মাধ্যমে, নদীপথে অবৈধভাবে নোঙ্গর করে রাখা প্রভাবশালী এসব কার্গো জাহাজ ও তাদের বেপরোয়া চলাচলের বিষয়ে দ্রুত জোরালো পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।

মুন্সিগঞ্জ লঞ্চ ঘাটের ইজারাদার,দিল মোহাম্মদ কোম্পানি বলেন, এ নৌরুটে একসময় ২০-২৫টি লঞ্চ চলাচল করতো। তবে বর্তমানে মুন্সিগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জ নৌরুটে ৮ লঞ্চ চলাচল করছে। বড় লঞ্চগুলোর মধ্যে খাঁজা, বিপ্লব সহ আরও বেশ কয়েকটি লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।এর অন্যতম কারণ সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর যত্রতত্র জাহাজ নোঙ্গর করা। এতে নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট সংকুচিত হয়ে গেছে। যার ফলে দূর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন,গত কয়েক বছরে বিভিন্ন জাহাজ ও লাইটার ভেসেলের সংঘর্ষে লঞ্চ ডুবিতে প্রাণ গেছে অসংখ্য মানুষের। বর্তমানে জাহাজগুলো এলোমেলো নোঙ্গরের কারণে রাতের আধারে বেড়েছে লঞ্চে ছিনতাই ও ডাকাতি মতো ঘটনা। এমন পরিস্থিতিতে এই পথটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়াতে নিয়মিত চলাচল করা যাত্রীর সংখ্যা কমে গেছে।

অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল যাত্রী পরিবহন সংস্থার নারায়ণগঞ্জ জোনের সভাপতি মো.বদিউজ্জামান বাদল বলেন, বর্তমানে নতুন লঞ্চ নামানোর আর্থিক সক্ষমতা নেই। তাই যাত্রীদের কথা চিন্তা করেই আগের লঞ্চ গুলো চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়।

নৌ পরিবহন সংশ্লিষ্ট সূত্রের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, একাধিবার দূর্ঘটনার পর নৌপথ সচল রাখার জন্য ২০২১ সালেই ১১টি লঞ্চকে পুনরায় চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছিলো। তবে যাত্রী কম থাকায় বর্তমানে ৮ টি লঞ্চ চলাচল করছে ঝুঁকি নিয়ে।

এদিকে ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চের বিষয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআইডবিউটিএ’র নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জ অঞ্চলের নদী বন্দরের উপ-পরিচালক (নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক) মোহাম্মদ শাহ আলম মিয়া জানান, যাত্রী কমে যাওয়া, লঞ্চ দূর্ঘটনা ও ছিনতাই সহ ডাকাতির মতো ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন। বিভিন্ন সিমেন্ট কারখানার কার্গো জাহাজগুলো নদীতে যত্রতত্র করে রাখে যার ফলে নদীতে নৌ-পুলিশ প্রতিনিয়ত টহল দেয়। ফলে এখন আর ছিনতাই তেমন ভাবে হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, যত্রতত্র কার্গো যাহাজ নোঙ্গর করে রাখার কারণে যাত্রীবাহী লঞ্চসহ বিভিন্ন নৌযান চলাচলে বিঘ্নতা ঘটছে। ছোটখাটো বিভিন্ন দূর্ঘটনা ঘটার তথ্যও আমরা পাচ্ছি। তবে এইসব জাহাজের মালিকরা বিভিন্ন মিল ফ্যাক্টরি ব্যক্তি। যতটুকু সম্ভব অভিযোগ পেলেই আমারা আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। এছাড়াও কার্গো জাহাজ মালিকরা যেনো সিরিয়াল মেনে জাহাজ নোঙ্গর করে প্রয়োজন অনুয়ায়ী, তাদের দ্রুত এমন নির্দেশনা পাঠানো হবে।

এদিকে ফিটনেসবিহীন এসব লঞ্চ ও তাদের মালিকদের পাশাপাশি প্রভাবশালী এসব কার্গো জাহাজের বিরুদ্ধে জনদুর্ভোগ সৃষ্টির অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেয়া বলে জানিয়েছেন, মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসক সৈয়দা নূরমহল আশরাফী। তিনি বলেন, জরাজীর্ণ এসব ফিটনেসবিহীন লঞ্চের অদক্ষ চালক ও মালিকদের বিরুদ্ধে আমরা বিভিন্ন সময় মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে  অভিযোগ পেলেই আর্থিক জরিমানা সহ আইনি ব্যবস্থা নিয়ে থাকি তবে এই নৌ পথের যাতায়াত ব্যবস্থার কোন পরিবর্তন না আসায় বিশেষ করে  চলমান বর্ষা মৌসুমে যাত্রীদের ঝুঁকি বেড়েছ। তাই কঠোর আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে, বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলে,নিরাপদ যাত্রী সেবা নিশ্চিত করার বিষয়ে অনুরোধ জানানো হবে।