এ এম সাদ্দাম হোসেন ॥ বিয়ের মাত্র দুই মাসের মাথায় যখন বরগুনার মিন্নি বিধবা হয়ে পাগলপ্রায়, রিফাত হত্যাকারীদের ধরতে হুমড়ি খেয়ে মরিয়া উঠে সর্বস্তরের প্রশাসন, ঠিক সেই মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে দেখা গেলো একদল পুরুষ জাতি নামে কাপুরুষের তামাশার জলসাঘর। কী নির্লজ্জ ও বেহায়াপনা হলে এ সমস্ত মানুষ রিফাত হত্যাকাণ্ড নিয়ে রঙ্গতামাশাময় পোস্ট দিয়ে ভরিয়ে তুলতে পারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকের বিভিন্ন গ্রুপ। সারাদেশ যখন রিফাত হত্যার বিচার চেয়ে উত্তাল হয়ে উঠছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই ফেইসবুকের বিভিন্ন আইডি থেকে এইরূপ পোস্ট লক্ষ্য করা যায়:- এমডি রাফি আহমেদ নামে একজন লেখেন : রিফাত নাই, নয়নও নাই, মিন্নির দায়িত্ব কে নেবে? মিন্নির দায়িত্ব আমি নিতে চাই, জনগণ কী আমাকে মেনে নেবে; পারভেজ আহমেদ নামে একজন লেখেন : কোপ খাবো জেনেও, অসহায় মিন্নিকে বিয়ে করতে যাচ্ছি, অসহায় মিন্নিকে বিয়ের জন্য ২-৩টা কোপ কিছুই না, দোয়া করবেন আমার জন্য; স্বপ্নের রাজকুমার নামে একজন লেখেন : বরগুনার মিন্নির দায়িত্ব নিতে চায় সুবিদখালীর বারেক হাওলাদার, এখন আন্নেরা কি কন, হেতি জাইতো নি; মুন্না সরকার নামে একজন লেখেন : দেশের সাধারণ জনগণ যদি, মিন্নি ভাবীর এই অসময়ে আমাকে পাশে দেখতে চায় আমার কোনো আপত্তি নাই। অন্যদিকে স্বপ্নের রাজকুমারের পোস্টের বিরুদ্ধে রাশেদ জামানের পোস্টটি ছিলো লক্ষণীয়, তিনি লেখেন : বরগুনার মিন্নির দায়িত্ব নিতে চায় সুবিদখালীর বারেক হাওলাদার, হাজারো মিন্নি দেশে আছে যারা কিনা ওর চেয়েও করুণ অবস্থায় জীবনযাপন করছে, পারলে তাদের দায়িত্ব নিন।
সব বিষয়েই বিনোদন নিতে এবং দিতে এই জাতির যেনো অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক সরব ছিলো রিফাত হত্যার বিচার চেয়ে পোস্টে।

 

 

উল্লেখ্য, গত ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজের মূল ফটকের সামনের রাস্তায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে জখম করা হয় রিফাত শরীফকে।

এ সময় বরগুনা সরকারি কলেজের স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্রী আয়েশা সিদ্দীকা মিন্নি তার স্বামীকে রক্ষার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালান। কিন্তু সন্ত্রাসীরা তাকে (রিফাত) উপর্যুপরি কুপিয়ে গুরুতর জখম করে পালিয়ে যায়।

পরে ওইদিন বিকেল ৩টার দিকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে রিফাত শরীফের মৃত্যু হয়। জনবহুল এলাকায় এমন নৃশংস হামলার ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে দেশেজুড়ে বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভের ঝড় ওঠে।

ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ২৭ জুন সকালে নিহত রিফাতের বাবা বরগুনা সদরের বড় লবণগোলার বাসিন্দা আবদুল হালিম শরীফ বাদী হয়ে বরগুনা সদর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।

মামলায় বরগুনা শহরে চিহ্নিত সন্ত্রাসী সাব্বির আহম্মেদ ওরফে নয়ন বন্ড এবং তার সহযোগী রিফাত ফরাজী ও তার ছোট ভাই রিশান ফরাজীসহ ১২ জনকে আসামি এবং আরও চার থেকে পাঁচজনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়।

এ মামলায় সোমবার পর্যন্ত নয়জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে চন্দন (২১), মো. হাসান (১৯), অলিউল্লাহ (২২) টিকটক হৃদয় (২১) এজাহারভুক্ত আসামি।

ঘটনার পরের দিন সকালে চন্দনকে, সন্ধ্যার মো. হাসান গ্রেফতার করা হয়। রোববার বরগুনা থেকে অলিউল্লাহকে (২২) এবং ঢাকা থেকে টিকটক হৃদয়কে (২১) গ্রেফতার করে পুলিশ। অন্য পাঁচজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হলেন নাজমুল ইসলাম (১৮), সাগর (১৯), তানভীর (২২), কামরুল হাসান ওরফে সাইমুন (২১)। অপর একজনের নাম পুলিশ প্রকাশ করেনি।

এর মধ্যে সোমবার (০১ জুলাই) বিকেলে এই মামলায় গ্রেপ্তার দুই আসামি অলিউল্লাহ ওরফে অলি ও তানভীর হোসেন ১৬৪ ধারায় বরগুনার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

ওইদিন বিকেলে বরগুনার বিচারিক হাকিম সিরাজুল ইসলাম গাজীর আদালতে ওই দুই আসামিকে উপস্থিত করে তাদের দুজনের এই জবানবন্দি নেওয়া হয়। অলিউল্লাহ রিফাত হত্যা মামলার ১১ নম্বর আসামি; তাকে রোববার গ্রেফতার হয়।

আর তানভীর সন্দেহভাজন আসামি। সে মূল আসামি নয়ন বন্ডের সন্ত্রাসী দল ‘০০৭’ এর সক্রিয় সদস্য।

তবে মামলা প্রধান আসামি নয়ন বন্ড ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হলেও প্রধান অপর দুই আসামি রিফাত ফরাজী ও তার ছোট ভাই রিশান ফরাজী এখনও পলাতক।

আর পুলিশ রিমান্ডে রয়েছেন আসামি নাজমুল হাসান, সাগর ও সাইমুন।