
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
দীর্ঘদিনের ভাঙন আতঙ্ক কাটাতে পদ্মার তীরে নির্মাণ করা হয়েছিল স্থায়ী নদী রক্ষা বাঁধ। বাঁধ নির্মাণের পর স্বপ্ন দেখেছিলেন নদীপাড়ের মানুষ এবার হয়তো আর হারাতে হবে না বসতভিটা, রক্ষা পাবে শেষ সম্বল। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে যেতে শুরু করেছে মাত্র দেড় মাসের মধ্যেই। মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার গাঁওদিয়া ইউনিয়নে নির্মিত নদী তীর রক্ষা বাঁধের একটি অংশ পদ্মার প্রবল স্রোতে ধসে পড়েছে। বাঁধের সিসি ব্লক একের পর এক সরে গিয়ে নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় নতুন করে ভাঙন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এলাকাজুড়ে।
সরেজমিনে বৃহস্পতিবার লৌহজং উপজেলার গাউদিয়া ইউনিয়নে ঘুরে দেখা স্থানীয়দের কাছে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পদ্মা পাড়ের ক্ষতিগ্রস্ত অংশের আশপাশের বসবাসকারী পরিবারগুলো রাত কাটাচ্ছেন উৎকণ্ঠায়। অনেকেই নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ঘরের মালামাল সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন।
ক্রা আক্ষেপ নিয়ে জানান, যে বাঁধকে ‘স্থায়ী সমাধান’ হিসেবে দেখানো হয়েছিল, সেটি নির্মাণের এত অল্প সময়ের মধ্যেই কেন এমন দুর্বল হয়ে পড়ল? নির্মাণ কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার কিংবা কাজের নিয়ম মানা হয়নি বলে অভিযোগ তাদের, ফলে দ্রুত বিষয়টি খতিয়ে দেখার তাগিদ দিয়েছে অনেকে।
ভুক্তভোগী নদীর তীরের বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম জানান, গত রবিবার বিকেলে গাঁওদিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের গাঁওদিয়া বাজারের পশ্চিম পাশে নদী তীর রক্ষা বাঁধে হঠাৎ ধস দেখা দেয়। প্রথমে কয়েকটি সিসি ব্লক সরে গেলেও পরে দ্রুত বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। কোনো ধরনের বড় শব্দ বা পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই বাঁধের ব্লকগুলো পদ্মার স্রোতে তলিয়ে যেতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নদীর কাছাকাছি বসবাসকারী পরিবারগুলো ভয়ে ঘর থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নিতে থাকেন।
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা মো. সাগর বলেন, বিকেলে হঠাৎ দেখি বাঁধের ব্লক ভেঙে নদীতে পড়ে যাচ্ছে। রাতে আমরা আতঙ্কে ঘরের জিনিসপত্র সরিয়ে নিয়েছি। এখন বুঝতে পারছি না, কোথায় থাকবো।পদ্মার ভাঙনে লৌহজংয়ের এই অঞ্চলের মানুষ বহুবার সর্বস্ব হারিয়েছেন। নদীর আগ্রাসনে বসতভিটা হারিয়ে নতুন জায়গায় আশ্রয় নেওয়া অনেক পরিবারের কাছে এই বাঁধ ছিল নিরাপত্তার শেষ ভরসা।
ভুক্তভোগী আরেক বাসিন্দা আব্দুল লতিফ খাঁন বলেন, ৩০ বছর আগে পদ্মার ভাঙনে সব হারিয়েছি। বাঁধ হওয়ার পর মনে হয়েছিল এবার শান্তিতে ঘুমাতে পারব। কিন্তু দেড় মাসের মধ্যেই যদি বাঁধের এই অবস্থা হয়, তাহলে আমরা যাব কোথায়? রিতা রাণী দে বলেন, বাঁধ দেখে মনে হয়েছিল আর ভয় থাকবে না। এখন আবার মনে হচ্ছে সব হারানোর সময় এসেছে। মনির চন্দ্র দে বলেন, আগে অনেক জায়গা-জমি নদীতে গেছে। এখানে এসে ভেবেছিলাম অন্তত থাকার জায়গাটা থাকবে। এখন সেই জায়গাটাও ঝুঁকিতে পড়েছে।
স্থায়ী বাঁধে এত দ্রুত ধস নামায় ক্ষোভ তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, নির্মাণকাজে কোনো ধরনের দুর্বলতা বা ত্রুটি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তারা বলছেন, বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই যদি বাঁধের এই অবস্থা হয়, তাহলে সামনে নদীর পানি ও স্রোত আরও বাড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।
ফলে স্থানীয়দের দাবি, শুধু জরুরি ভিত্তিতে ব্লক বসালেই হবে না; বাঁধের নকশা, নির্মাণ কাজের মান এবং ব্যবহৃত উপকরণের গুণগত বিষয়ও যাচাই করতে হবে। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে গাঁওদিয়া বাজারসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এদিকে ভাঙ্গনের খবর ছড়িয়ে পড়লে গতকাল সোমবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা ববি মিতু। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, গত মঙ্গলবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। সেই দিন রাতেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা উপস্থিত হয়ে ফাটল স্থানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুতি নিয়েছেন।
মুন্সিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী শেখ এনামুল হক বলেন, এখন ভয়ের কোনো কারণ নেই। খবর পাওয়ার পর থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে রয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিমাপ করে ভাঙ্গন প্রতিরোধে সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে পদ্মায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায়, স্রোতের তীব্রতা বেড়েছে কয়েকগুণ বেশি। নদীর তীরে মাটি সরে যাওয়ায় স্থায়ীভাবে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে তাই জিও ব্যাগ ফলে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে তবে স্থায়ী বাঁধের কাজের মান কিংবা নির্মাণে সঠিক নিয়ম মানা হয়েছে কিনা সেই বিষয়ে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
উল্লেখ্য, পদ্মা বহুমুখী সেতুর ভাটিতে মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলাধীন বিভিন্ন স্থানে পদ্মা নদীর বাম তীর সংরক্ষণ প্রকল্পটি অক্টোবর ২০২১ সাল থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৫ মেয়াদকাল থাকলেও পরবর্তীতে মেয়াদকাল বাড়ানো হয়েছে। ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দে ৯ দশমিক ১০ কিলোমিটার নদীর তীরবর্তী এলাকায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ কাজের ধীরগতি।
অন্যদিকে মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার বাংলাবাজার ও শিলই ইউনিয়ন সহ টঙ্গীবাড়ী উপজেলার দিঘীরপাড় ইউনিয়নের নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন গ্রামে নতুন করে দেখা দিয়েছে ভাঙ্গন ফলে সেখানেও নির্ঘুম রাত কাটছে অনেকের। এতে ভাঙ্গন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের তাগিদ ক্ষতিগ্রস্তদের।
