
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
পদ্মা সেতু রেলসংযোগে যুক্ত হচ্ছে নতুন ট্রেন। বাড়ছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগের সম্ভাবনা, বাড়ছে যাত্রীদের প্রত্যাশাও। আগামী ১০ আগস্ট ঢাকা-পদ্মা সেতু-গোপালগঞ্জ রুটে চালু হচ্ছে ‘অভিযাত্রী কমিউটার’ নামে একজোড়া ট্রেন।
তবে নতুন এই যাত্রার আগেই সামনে এসেছে রেলপথের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যাল ব্যবস্থার সরঞ্জাম চুরি হয়ে যাওয়ায় কয়েকটি এলাকায় ব্যাহত হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। বাধ্য হয়ে শত বছরের পুরোনো ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পরিচালনা করতে হচ্ছে ট্রেন।
গতকাল রবিবার (০৯ আগস্ট) সরেজমিনে দেখা গেছে, পদ্মা সেতু রেলসংযোগের মাওয়া, শ্রীনগর ও নিমতলা স্টেশন এলাকার আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থায় রয়েছে নানা জটিলতা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়,দফায় দফায় চুরি হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ক্যাবল,দ্রুতগামী ট্রেন নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম সহ প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন উপকরণ। এতে আধুনিক ইন্টারলকিং সিস্টেম ও স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থার পূর্ণ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না সবগুলো লাইনে,প্রায় ৭০% শতাংশ অচল এখন আধুনিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
মাওয়া রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার সাইফুল ইসলাম খোকন বলেন, চারটি লাইনের মধ্যে বর্তমানে দুটি লাইন ব্যবহার করে ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। সিগন্যাল ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে বাড়তি সতর্কতার সঙ্গে ট্রেন পরিচালনা করতে হচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল কাজ না করায় ট্রেনের অবস্থান নিশ্চিত করতে ফোনে যোগাযোগ এবং চালকদের লিখিত নির্দেশনা দিয়ে ট্রেন চালাতে হচ্ছে।
রেল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিগন্যাল ব্যবস্থা শুধু ট্রেন চলাচলের নির্দেশনা নয়, এটি দুর্ঘটনা প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান নিরাপত্তা ব্যবস্থা। একটি ছোট যন্ত্রাংশ অকার্যকর হলেও পুরো রেল পরিচালনায় তৈরি হতে পারে বড় ঝুঁকি।
স্থানীয় বাসিন্দা জাকিউল্লাহ্ সিদ্দিক বলেন, দেশের অন্যতম আধুনিক এই রেল প্রকল্পে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার দুর্বলতা যাত্রীদের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
আজ ১০ আগস্ট পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা-গোপালগঞ্জ রুটে চালু হচ্ছে নতুন কমিউটার ট্রেন ‘অভিযাত্রী’। বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন স্বাক্ষরিত অফিস আদেশ অনুযায়ী, ট্রেনটির নম্বর হবে ১৩৫/১৩৬। এতে থাকবে ৮টি কোচ, আসন সংখ্যা ৬০৯টি।
প্রাথমিক সময়সূচি অনুযায়ী, ঢাকা থেকে প্রতিদিন বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে গোপালগঞ্জ পৌঁছাবে সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে। ফেরার পথে গোপালগঞ্জ থেকে ছাড়বে সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে এবং ঢাকায় পৌঁছাবে রাত ১০টা ২৫ মিনিটে। শনিবার থাকবে সাপ্তাহিক বন্ধ। ট্রেনটি কেরানীগঞ্জ, শ্রীনগর, মাওয়া, শিবচর, ভাঙ্গা জংশন, নগরকান্দা ও মহেশপুর স্টেশনে যাত্রাবিরতি করবে।
তবে প্রশ্ন উঠছে নতুন ট্রেন চালুর আগে রেলপথের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত?
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান বলেন, পদ্মা সেতু রেলপথের প্রায় সব জায়গাতেই চুরির ঘটনা ঘটেছে। সিগন্যাল সরঞ্জামের সুরক্ষায় খাঁচা স্থাপন করা হয়েছে, এতে চুরির ঘটনা কিছুটা কমেছে। তবে কয়েক দফায় চুরি হয়েছে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রাংশ।
তিনি বলেন, চুরি হওয়া সরঞ্জাম প্রতিস্থাপন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারে কাজ চলছে। তবে চুরি একটি চলমান প্রক্রিয়া হয়ে ওঠায় এটি পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।
তিনি আরও বলেন, সিগন্যাল সরঞ্জাম চুরি ও জনবল সংকটের কারণে নিমতলা ও শ্রীনগর স্টেশনে অস্থায়ী লোকবল দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ট্রেনের সংখ্যা বাড়লে প্রয়োজন অনুযায়ী জনবলও বাড়ানো হবে।
তবে তিনি স্বীকার করেন, সিগন্যাল ব্যবস্থা ঠিকভাবে কাজ না করলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। যাত্রী নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে রেল পরিচালনা করা হচ্ছে।
জেলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ সহকারী পরিচালক সফিকুল ইসলাম জানান, প্রযুক্তিগত সংকটের পাশাপাশি পদ্মা রেলসংযোগ এলাকায় রয়েছে জননিরাপত্তার উদ্বেগ। গত দুই বছরে মুন্সিগঞ্জে ট্রেনে কাটা পড়ে অন্তত ৮ জন পথচারীর মৃত্যু হয়েছে। ১ জন গুরুতর আহত হয়েছে। মোট ৯ টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রেললাইনের আশপাশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নজরদারি ও সচেতনতা কার্যক্রম না থাকায় ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে মাওয়া, শ্রীনগর ও নিমতলা এলাকায় রেললাইনে মানুষের অবাধ চলাচল দেখা যায়। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামোগত সংকটের কারণে নিমতলা ও শ্রীনগর স্টেশনগুলো পুরো সক্ষমতায় কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
মুন্সিগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুস সালাম আজাদ বলেন, কিছু মাদকাসক্ত ব্যক্তি এসব যন্ত্রাংশ চুরি করছে। এগুলো দেশের সম্পদ, রক্ষা করার দায়িত্ব সবার। তিনি বলেন, প্রতিটি সিগন্যাল বাতির সামনে সার্বক্ষণিক পুলিশ বা আনসার মোতায়েন করা সম্ভব নয়। তাই স্থানীয় জনগণকে সচেতন হয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করতে হবে।