- মুন্সিগঞ্জ প্রতিদিন - https://munshiganjprotidin.com -

দ্বৈত টোলে শিমুলিয়া ঘাটে পর্যটক ধস, ক্ষুব্ধ দর্শনার্থীদের ঘোষণা ‘বয়কট মাওয়া’

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

পদ্মার পাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে যে শিমুলিয়া ঘাটে প্রতিদিন ভিড় করতেন হাজারো পর্যটক ও দর্শনার্থী, সেই ঘাটেই এখন দেখা দিয়েছে ভিন্ন চিত্র। ঘাটের প্রবেশ মুখে মাত্র আধা কিলোমিটার পথের ব্যবধানে দুই দফা টোল আদায়ের অভিযোগে ক্ষুব্ধ দর্শনার্থীরা রীতিমত বয়কটের ডাক দিয়েছেন ‘শিমুলিয়া ঘাট’

অন্যদিকে পর্যটকদের অনাগ্রহে গত দুই সপ্তাহে ঘাট এলাকায় দর্শনার্থীর সংখ্যা কমেছে বলে দাবি স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ীদের এতে ভাটা পড়েছে বাণিজ্যিক সব কার্যক্রমে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়,শিমুলিয়া ঘাটে মাত্র আধা কিলোমিটারের পথের ব্যবধানে পরপর দুইটি স্থানে বিভিন্ন যানবাহন থেকে টোল আদায়কে কেন্দ্র করে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন পর্যটক ও দর্শনার্থীরা। সম্প্রতি টাকা আদায় কে কেন্দ্র করে রাজধানী থেকে আসা চার পর্যটককে মারধরের অভিযোগ পাওয়া গেছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের লোকজনদের বিরুদ্ধে।

সরেজমিনে বুধবার (২৯ জুলাই) লৌহজংয়ে গিয়ে ঘাট এলাকায় দেখা গেছে,ঢাকা মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে থেকে মাওয়া চৌরাস্তা হয়ে, শিমুলিয়া ঘাটের দিকে কিছুদূর এগিয়ে গেলেই,ফেরিঘাটের একদম প্রবেশ পথে হাতের ইশারায় থামানো হচ্ছে মোটরসাইকেল প্রাইভেটকার সহ ব্যক্তিগত বিভিন্ন যানবাহন কিংবা পিকনিকে জন্য আসা যাত্রীবাহী বাস। এরপর সেসব যানবাহনকে ঘিরে ধরছে লাঠি হাতে থাকা ৪-৫ জন, পরে পর্যায়ক্রমে চালকরা দিচ্ছেন নগদ অর্থ।

সরেজমিনে দেখা গেছে,মাত্র আধা কিলোমিটার দূরত্বে মধ্যেই পরপর দুইবার টাকা দিতে হচ্ছে যানবাহন চালক ও পর্যটকদের।

পদ্মা পাড়ে আগত দর্শনার্থীদের অভিযোগ, পর্যটকদের বিআইডব্লিউটিএ লোগো সম্বলিত হলুদ ও আকাশী রঙের একটি টোকেন ধরিয়ে দিয়ে মোটরসাইকেল থেকে নেয়া হচ্ছে সর্বনিম্ন ৩০ টাকা করে দুইবারের ৬০ টাকা।

আর প্রাইভেট কার সহ ব্যক্তিগত বিভিন্ন যানবাহন থেকে বিনা রশিদের মাধ্যমে শুধুমাত্র গাড়ির নাম্বার নোট করেই নেয়া হচ্ছে ১শ টাকা থেকে শুরু করে দুইশ- আড়াইশো/তিনশো টাকা পর্যন্ত।

এ সময় দেখা গেছে অনেক যানবাহন চালক টাকা আদায়ের রশিদ দিতে বাধ্য করেছেন ঠিকাদার সংশ্লিষ্টদের। তবে আদায়কৃত অর্থের সমপরিমাণ টাকার সংখ্যা উল্লেখিত রশিদ দিতে পারেননি কেউ।

অভিযোগ রয়েছে,বিআইডব্লিউটিএর রশিদের মাধ্যমে এসব টাকা তুলছেন স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র। তবে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রাজি নয় এই চক্রের সদস্যরা। তবে তাদের দাবি ইজারাদার হাজী আলমগীরের নেতৃত্বে এইসব টোল আদায় করা হচ্ছে।

এদিকে একইদিন সরেজমিনে আরও দেখা গেছে, একসময় ঘাট এলাকায় যেখানে বিকেল হলেই জমে উঠতো মানুষের ভিড়, পরিবার-পরিজন আর বন্ধুদের নিয়ে পদ্মার সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে আসতেন দূর-দূরান্তের মানুষ, সেই শিমুলিয়া ঘাটেই এখন দেখা দিয়েছে পর্যটক সংকট।

আগত দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথা হলে অভিযোগ করেন, অতীতে পদ্মা পারে প্রবেশ করতে কোন যানবাহনকেই দফায় দফায় টোল দিতে হয়নি। শুধুমাত্র ঘাট এলাকায় পার্কিংয়ে আরে কোন যানবাহন পার্কিং করলে সেই ক্ষেত্রে সামান্য কিছু টাকা টোল দিতে হতো ফলে, ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন একই এলাকায় এত অল্প দূরত্বে বারবার টোল আদায় কেন? কিসের ভিত্তিতে এত টাকা নেয়া হচ্ছে?

স্থানীয় সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা আরও গেছে,দ্বৈত টোল আদায়ের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পর্যটননির্ভর ব্যবসা বাণিজ্যিক কার্যক্রমে। হোটেল ব্যবসায়ীদের দাবি, গত দু-সপ্তাহে শিমুলিয়া ঘাটে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত প্রচুর মানুষের সমাগম ঘাটলেও এখন ঘাটে শুনশান নীরবতা। এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে অনেকের।

তবে বিআইডব্লিউটিএ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি জুলাই মাসের ১ তারিখ থেকে ১ কোটি ৪৭ লাখ ৬৬ হাজার টাকার বিনিময় শিমুলিয়া ঘাটটি  ইজারা দেয়া হয়েছে আলমগীর হোসেন নামের স্থানীয় এক ঠিকাদারকে।

এরপর থেকেই দৈনদশা দেখা দিয়েছে ঘাট এলাকায় ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত টোলের কারণে যদি পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহলে শুধু ব্যবসা নয় শিমুলিয়া ঘাটের পর্যটন সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

রাজধানীর আরামবাগ থেকে পরিবার নিয়ে পদ্মা পাড়ে বেড়াতে আসা ভুক্তভোগী দর্শনার্থী সুমনা আক্তার জানান, ঢাকা থেকে মাওয়া পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার মহাসড়ক পাড়ি দিতে গাড়িটির টোল দিতে হয়েছে সব মিলিয়ে ১৮০ টাকা।  তবে ঘাট এলাকায় মাত্র আধা কিলোমিটার পাড়ি দিতে তাদের দিতে হয়েছে ২০০ টাকা। ফলে বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তিনি।

একই রকম ভাবে ভুক্তভোগী আরেক দর্শনার্থী সাইফুল আলম মজুমদার জানান, দুই চাকার বাহন মোটরসাইকেল নিয়ে ঢাকা থেকে মাওয়া পর্যন্ত আসতে তাকে মহাসড়কে টোল দিতে হয়েছে মাত্র ১০ টাকা। কিন্তু ঘাট এলাকায় ঢুকতেই প্রথমে একবার দিয়েছেন ৩০ টাকা এরপর আবার কিছু দূর এগিয়ে যেতেই আবার তাকে দিতে হয়েছে আরও ৩০ টাকা। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক দাবি করে তিনি বলেন, পর্যটন সম্ভাবনাময় একটা এলাকাকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য মাত্রা অতিরিক্ত টোল আদায় সহ চলছে নানা রকম ভাবে পর্যটক হয়রানি। তিনি অভিযোগ করেন, দফায় দফায় টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে লাকি সোটা হাতে তাকে হুমকি দিয়ে মারতে এসেছে ঠিক আদার সংশ্লিষ্টদের লোকজন।

এর আগে,সর্বশেষ গত ১৬ জুলাই রাতে টোল আদায়কারীদের সঙ্গে পর্যটকদের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, অতিরিক্ত টোলের প্রতিবাদ করায় ইজারাদারের লোকজন কয়েকজন পর্যটকের ওপর হামলা চালিয়ে পিটিয়ে আহত করে ৪/৫ জনকে।

ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক সাইফুদ্দিন বেপারী বলেন, মাত্র আধা কিলোমিটার রাস্তার জন্য আলাদা করে আবার টোল নেওয়াটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। তিনি বলেন,ঘাট এলাকায় টোলের নামে নারী পর্যটকদের ও হয়রানি করা হচ্ছে নিয়মিত। এভাবে চলতে থাকলে মানুষ শিমুলিয়া ঘাটে আসা বন্ধ করে দেবে।

ঘাট এলাকার হোটেল ব্যবসায়ী নাজমুল হাসান পিন্টু, শরীফ মোল্লা, আহাম্মেদ দেওয়ান সহ আরো বেশ কয়েকজন বলেন, নতুন টোল চালুর পর থেকেই পর্যটক কমতে শুরু করেছে ঘাট এলাকায়। আমাদের ব্যবসা মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পদ্মা পাড়ে আগত সাধারণ দর্শনার্থীকে সেবা দেওয়ার পরিবর্তে বিআইডব্লিউটিএ এখনে টোল নির্ভর ব্যবসা করছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, শিমুলিয়া ঘাটের বন্দর কর্মকর্তা শাহ নেওয়াজ স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে যোগসাজশ করে, এ টোল ব্যবস্থা চালু করেছেন। তার বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে বলে দাবি করেন তিনি।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বন্দর কর্মকর্তা শাহ নেওয়াজ ঠিকাদারের পক্ষে সাফাই গেয়ে বিষয়টি ভিত্তিহীন দাবি করেছেন। তিনি বলেন, মানুষ যেটাকে চাঁদাবাজি বলছে সেটা চাঁদাবাজি নয়। সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে টেন্ডারের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে। তবে কোন যানবাহন থেকে কি পরিমান টাকা নিতে হবে বিআইডব্লিউটিএর পক্ষ থেকে সুস্পষ্টভাবে সেই নির্দেশনা দেয়া হয়েছে কিনা বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা ইজারাদারের বিষয়। এছাড়া সুনির্দিষ্ট কোন পার্কিং ব্যবস্থা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, পর্যটক ও দর্শনার্থীরা যেখানে গাড়ি পার্কিং করবে ঘাট এলাকায় সেখানেই তাকে টাকা দিতে হবে।

এদিকে মাত্র অতিরিক্ত টাকা ও দুই দফা টোল নেয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে, ইজারাদার আলমগীর হোসেন দাবি করেছেন, বিআইডব্লিউটিএ থেকেই দুই দফা টোল আদায় করা সহ দর্শনার্থীদের কাছ থেকে টাকা যানবাহন পার্কিং করার জন্য টাকা নেয়ার বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা ভ্যাট ট্যাক্স সহ প্রায় দুই কোটি টাকার কাছাকাছি টাকার বিনিময়ে ঘাট-টি ইজারা নিয়েছি। এখন বিআইডব্লিউটিএ আমাদের যেভাবে নির্দেশনা দিচ্ছে আমরা সেটাই বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি।

পদ্মার সৌন্দর্য দেখতে আসা মানুষের কাছে শিমুলিয়া ঘাট ছিল স্বস্তি আর বিনোদনের ঠিকানা উল্লেখ করে মুন্সিগঞ্জ-২ আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ বলেন, একটি কুচক্রী মহল বিএনপি ও সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য মাত্র আধা কিলোমিটার সড়কে দুইবার টোলের টাকা নিচ্ছে। ঘাট এলাকায় পর্যটক হয়রানি সহ না না অনিয়ম চলছে দাবি করে তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে অভিযোগ জানিয়েছেন তিনি।

তবে বিতর্কের মুখে, স্থানীয় প্রশাসন বলছে, বিষয়টি নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারাজানা ববি মিতু বলেন, শিমুলিয়া ঘাটে কাছাকাছি দুটি টোল নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতা সমাধানের চেষ্টা চলছে।

তিনি আরো বলেন,এ বছরই নতুন রাস্তা ব্যবহারের জন্য বিআইডব্লিউটিএ টোল ইজারা দিয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। খুব কাছাকাছি দুটি টোল জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। আমরা এটি বাতিলের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসক বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। আশা করছি, দ্রুতই সমস্যার সমাধান হবে।

এদিকে এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, মাত্র ৫০০ মিটার দূরত্বে দুটি পৃথক টোল আদায় কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। এতে একদিকে সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে শিমুলিয়া ঘাটের পর্যটন সম্ভাবনাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তারা অবিলম্বে দ্বৈত টোল ব্যবস্থা বাতিল, অতিরিক্ত টোল আদায় বন্ধ এবং হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।