- মুন্সিগঞ্জ প্রতিদিন - https://munshiganjprotidin.com -

“মুন্সিগঞ্জের ১৬ শহীদের স্মরণীয় আত্মত্যাগ”

 

আরাফাত রায়হান সাকিবঃ

জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনে গুলিবর্ষণ, সহিংসতা ও দমন-পীড়নের মধ্যেও রাজপথ ছাড়েননি হাজারো মানুষ। সেই রক্তাক্ত আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো মুন্সিগঞ্জ ও দিয়েছে ত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আন্দোলনে জেলার অন্তত ১৬ জন শহীদ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ছাত্র, শ্রমিক, দিনমজুর, ব্যবসায়ী, প্রবাসফেরত, চাকরিজীবী ও রাজনৈতিক কর্মী। প্রত্যেকের পেছনে ছিল একটি পরিবার, কিছু স্বপ্ন আর একটি অসমাপ্ত জীবনগাথা।

সবচেয়ে কম বয়সী শহীদদের একজন ছিলেন শ্রীনগরের উত্তর কোলাপাড়া গ্রামের সাইদুল ইসলাম শোভন (১৯)। শেখ বোরহানউদ্দিন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজের শিক্ষার্থী শোভনের স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষা অর্জনের। ১৯ জুলাই ঢাকার নিউমার্কেট এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণের সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। পরে রাজধানীর চানখারপুল এলাকায় তাঁর স্মরণে “বীর শহীদ শোভন চত্বর” নামকরণ করা হয়।

একই দিনে উত্তরায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান শ্রীনগরের কাশেমনগরের আল আমিন খলিফা (১৮)। বড় ভাইয়ের সঙ্গে একটি ওয়ার্কশপে কাজ করতেন তিনি। রংপুরে আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের পর আন্দোলনে যুক্ত হন। উত্তরার রাজপথে দুটি গুলি তাঁর শরীরে বিদ্ধ হলে হাসপাতালে নেওয়া হলেও তাঁকে আর বাঁচানো যায়নি।

লৌহজং উপজেলার কুমারভোগ ইউনিয়নের মৌছা গ্রামের মো. রাকিব হোসেন (২৪) ছিলেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনে হতাহতের খবর দেখে মাকে বলেছিলেন, “সব মানুষ মাইরা ফেলতাছে, আমাকে যাইতে হবে।” আফতাবনগরে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন তিনি। ছেলেকে হারিয়ে মা হারিয়েছেন জীবনের হাসি।

লৌহজংয়ের ঘোড়দৌড় গ্রামের মো. সোহেল রানা (৩৭) ১৮ জুলাই যাত্রাবাড়ির দক্ষিণ কাজলায় নিখোঁজ হন। ৩৪ দিন পর পরিবার জানতে পারে, শারীরিক নির্যাতনের পর তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। প্রথমে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হলেও পরে পরিবার তাঁর কবরের অবস্থান নিশ্চিত হতে পারে।

গজারিয়ার বড় রায়পাড়ার মেহেদী হাসান (২০) প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। ফুটবল খেলতে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়ে আন্দোলনে যোগ দেন। নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় গুলিতে নিহত হন। মৃত্যুর পর প্রকাশিত ফলাফলে তিনি ডিপ্লোমা পরীক্ষায় ৪-এর মধ্যে ৩.৪২ জিপিএ অর্জন করেন।

মিরকাদিম পৌরসভার রামগোপালপুর এলাকার ছাত্রদল নেতা শারিক চৌধুরী মানিক (২৯) ৫ আগস্ট চানখারপুলে “মার্চ টু ঢাকা” কর্মসূচিতে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। বিজয় দেখে যেতে না পারলেও তাঁর কফিন মোড়ানো হয়েছিল লাল-সবুজের পতাকায়।

মুন্সিগঞ্জ সদরের সুখবাসপুর গ্রামের ফরিদ শেখ (২৯) জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে কলার ব্যবসা শুরু করেছিলেন। ৪ আগস্ট যাত্রাবাড়িতে গুলিবিদ্ধ হয়ে দুই দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৬ আগস্ট মারা যান।

শ্রীনগরের শ্যামসিদ্ধির মো. আক্কাস আলী (৪৪) ৫ আগস্ট আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছেলেকে খুঁজতে বের হয়ে নিজেই যাত্রাবাড়িতে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান। ছেলে ফিরলেও বাবা আর ফিরে আসেননি।

সিরাজদিখানের মধ্যপাড়ার এসএসসি পরীক্ষার্থী মোস্তাফা জামান সমুদ্র (১৭) জুমার নামাজের কথা বলে বাসা থেকে বের হয়ে রামপুরার আন্দোলনে যোগ দেন। গুলিতে আহত হয়ে রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়। রাতের আঁধারে গ্রামের বাড়িতে তাঁকে দাফন করা হয়।

লৌহজংয়ের কুমারভোগের মেহেদী হাসান প্রান্ত (১৮) জাপানে পড়াশোনার স্বপ্ন দেখতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯ জুলাই কদমতলীতে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। পরে দাফন নিয়েও নানা বাধার মুখে পড়ে পরিবার।

লৌহজংয়ের গাওদিয়ার মো. বাবুল হাওলাদার (৫২) দুই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনে অংশ নেন। রামপুরায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নয় দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৮ জুলাই মারা যান।

মাত্র ১৬ বছর বয়সী আশরাফুল ইসলাম অন্তর ছিলেন মায়ের একমাত্র সন্তান। ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ি থানার সামনে বিজয় মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন। দুই দিন পর ঢাকা মেডিকেলে তাঁর মরদেহ শনাক্ত করে পরিবার।

গজারিয়ার ইমামপুর গ্রামের মুজিবুর রহমান সরকার (৫৫) দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলেন। দেশে ফিরে আন্দোলনের সময় কদমতলী এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পরিবার হারায় একমাত্র অভিভাবককে।

৪ আগস্ট: মুন্সিগঞ্জ শহরের রক্তাক্ত কালো অধ্যায়।

জেলার ১৩ শহীদের পাশাপাশি ৪ আগস্ট মুন্সিগঞ্জ শহর নিজেও প্রত্যক্ষ করে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ। সেদিন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ডাকে সকাল ১০টায় ইসলামপুর ও ইদ্রাকপুর মোড় থেকে ছাত্র-জনতার মিছিল বের হলে হামলার ঘটনা ঘটে। পরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ত্রিমুখী সংঘর্ষ শুরু হয়।

কৃষি ব্যাংক এলাকা থেকে পুরাতন বাসস্ট্যান্ড ও মানিকপুর সড়ক পর্যন্ত হাজারো মানুষ অবস্থান নেয়। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত টানা সাত ঘণ্টা শহরজুড়ে চলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, গুলিবর্ষণ ও ককটেল বিস্ফোরণ। হাসপাতাল ও মুক্তারপুর এলাকায় অ্যাম্বুলেন্স থামিয়ে হামলার অভিযোগও ওঠে। এতে অসংখ্য মানুষ আহত হন।

সেই দিনের সংঘর্ষে শহীদ হন ইসলামপুর এলাকার তিন বাসিন্দানূর মোহাম্মদ সরদার (ডিপজল-১৭), রিয়াজুল ফরাজী (৩৫) এবং মো. সজল।

প্রথম গুলিতে প্রাণ হারান কিশোর ডিপজল। নানার বাড়িতে বড় হওয়া এই কিশোরের মাথায় গুলি লাগলে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।

এরপর গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান দিনমজুর রিয়াজুল ফরাজী। তাঁর মৃত্যুতে দুই কন্যা সন্তান এতিম হয়ে যায় এবং স্ত্রী হয়ে পড়েন স্বামীহারা।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল শ্রমিক মো. সজলের আত্মত্যাগ। ভাই সাইফুলের সঙ্গে ভাত খাওয়ার সময় গুলির শব্দ শুনে তিনি খাবার অসমাপ্ত রেখেই বেরিয়ে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, বের হওয়ার আগে তিনি বলেছিলেন, “হয় আজকে শহীদ হমু, নয় স্বাধীন।” প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ছাত্র-জনতাকে রক্ষা করতে তিনি দুই হাত প্রসারিত করে সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন তিনি।

সাত ঘণ্টার সেই সংঘর্ষ শেষে মুন্সিগঞ্জ শহরের রাজপথজুড়ে পড়ে ছিল ইট-পাটকেল, গুলির খোসা ও রক্তের দাগ। পরে ছাত্র-জনতা শহরের সুপারমার্কেট চত্বরের নাম দেয় “শহীদ চত্বর”।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মুন্সিগঞ্জের ১৬ শহীদ শুধু একটি জেলার নয়, সমগ্র বাংলাদেশের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁদের অসমাপ্ত স্বপ্ন, পরিবারের অশ্রু এবং আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে মনে করছে স্থানীয়রা।